নাছির উদ্দিন সোহেল, সিবিএন;

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী ১৩ জুন কক্সবাজার সফরকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার সিটি কলেজ জাতীয়করণের দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, জেলার অন্যতম বৃহৎ এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হলে কক্সবাজারের শিক্ষা খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

দাবির অংশ হিসেবে কক্সবাজার সিটি কলেজ ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং ছাত্র অধিকার পরিষদ তারেক রহমানের কাছে একটি খোলা চিঠি প্রদান করেছে। চিঠিতে কলেজটির প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে জাতীয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার সিটি কলেজ বর্তমানে জেলার অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী ও ১৬৫ জন শিক্ষকের সমন্বয়ে পরিচালিত কলেজটিতে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি, অনার্স, মাস্টার্স ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

কলেজটিতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি বিভাগ রয়েছে। ডিগ্রি পর্যায়ে বিএ, বিএসএস ও বিবিএস কোর্সের পাশাপাশি ১৩টি বিষয়ে অনার্স, ২টি বিষয়ে প্রফেশনাল অনার্স, ৭টি বিষয়ে নিয়মিত মাস্টার্স, ৬টি বিষয়ে প্রিলিমিনারি ও প্রাইভেট মাস্টার্স এবং একটি পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্স চালু রয়েছে।

পর্যটননির্ভর কক্সবাজারের চাহিদা বিবেচনায় কলেজটিতে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব বিভাগ এ অঞ্চলের দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এছাড়া বিশ্বব্যাংকের কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি)-এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত আধুনিক কম্পিউটার, পদার্থবিজ্ঞান, বায়োকেমিস্ট্রি এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ল্যাব শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পরীক্ষায়ও কলেজটির শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করে আসছে।

কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, মরহুম সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দানকৃত ৫ একর জমির ওপর কক্সবাজার সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নানা সীমাবদ্ধতা ও অবহেলার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, “তারেক রহমানের উদ্যোগে কলেজটি জাতীয়করণ হলে কক্সবাজারের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। এতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে এবং জেলার অসংখ্য শিক্ষার্থী উপকৃত হবে।”

কলেজের অধ্যক্ষ আকতার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জমি দান এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের প্রচেষ্টায় ১৯৯৩ সালে সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কলেজটি এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিষয় বৈচিত্র্য, অবকাঠামো ও একাডেমিক সক্ষমতার দিক থেকে জাতীয়করণের জন্য কলেজটি সম্পূর্ণ উপযুক্ত।

শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পর্যটনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে কক্সবাজার সিটি কলেজ। জাতীয়করণ হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উন্নত একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত হবে এবং গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মঈনুল হাসান পলাশ বলেন, কক্সবাজার সিটি কলেজ জাতীয়করণ হলে শুধু এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং পুরো জেলার মানুষ উপকৃত হবে। বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় পরিচালনাগত ব্যয় নির্বাহের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি টিউশন ফি নিতে হয়। কলেজটি জাতীয়করণ হলে শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ কমবে এবং শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, কক্সবাজার সিটি কলেজ দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কলেজটি জাতীয়করণ হলে শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

কক্সবাজার সিটি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি শিবলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রাণের দাবি হচ্ছে সিটি কলেজ জাতীয়করণ। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, আধুনিক অবকাঠামো, ফলাফল ও একাডেমিক সক্ষমতার বিচারে কলেজটি জাতীয়করণের সব যোগ্যতা অর্জন করেছে। তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে আমরা শিক্ষার্থীদের এ ন্যায্য দাবির বিষয়টি তাঁর নজরে আনতে চাই।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অনেকেই আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত টিউশন ফি পরিশোধ করতে না পেরে পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। সিটি কলেজ জাতীয়করণ হলে আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীরা সরাসরি উপকৃত হবে এবং উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথ আরও সহজ ও সুগম হবে।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটন, নীল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুর কারণে কক্সবাজারের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অঞ্চলের জন্য দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তুলতে শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। সে বিবেচনায় কক্সবাজার সিটি কলেজ জাতীয়করণ হলে জেলার শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং হাজারো শিক্ষার্থী সরাসরি উপকৃত হবে।

স্থানীয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রত্যাশা, তারেক রহমানের কক্সবাজার সফরকে ঘিরে উত্থাপিত এ দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং কক্সবাজার সিটি কলেজ জাতীয়করণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেবে। তাদের বিশ্বাস, এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে জেলার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।